গবেষণালব্ধ ফলাফল ক্যানসারের ঔষধ উদ্ভাবনে সহায়ক হবে: ড. নারগীস সুলতানা

SHARE

image-8455-1532250521ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ বিডি ডট কম,ঢাকা প্রতিনিধি,২৬ জুলাই :  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্প্রতি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন নারগীস সুলতানা চৌধুরী। তার গবেষণার বিষয় ছিল ‘Bioactive Compounds from three Aquatic Plants and their Associated Endophytic Fungi.’ এই গবেষণালব্ধ ফলাফল ভবিষ্যতে নতুন ঔষধ উদ্ভাবনে উল্লেখযোগ্য রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষ করে অ্যান্টি ক্যানসার ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ঔষধ উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। বর্তমানে মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন নারগীস সুলতানা। গবেষণালব্ধ ফলাফল নিয়ে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি এ নিয়ে তিনি কথা বলেছেন এবিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম’র সাথে।

গবেষণার আরও অনেক বিষয় থাকতে আপনি একুয়াটিক প্লান্ট ও এন্ডোফিটিকে ফাংগি নিয়ে কাজের ক্ষেত্র বেছে নিলেন কেন?

নারগীস সুলতানা : বাংলাদেশে একুয়াটিক প্লান্ট বা জলজ উদ্ভিজ্জ-এর প্রাচুর্যতা রয়েছে। কিন্তু এ ধরনের উদ্ভিজ্জ নিয়ে তেমন ফার্মাকোলজিক্যাল, ফাইটোকেমিক্যাল ও মেডিকেল স্ট্যাডি বা অধ্যয়ন নেই। এন্ডোফিটিক ফাংগি নোবেল বায়োএকটিভ কমপাউন্ডসের আশাবাদী উৎস। এন্ডোফিটিক ফাংগি নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশে এক নতুন ধারণাও বটে। খুব অল্প সংখ্যক বিজ্ঞানী এ ধরনের কাজে এদেশে আছে।

ওয়ার্ল্ড ক্রাইম : আপনার এই গবেষণার কাজে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন?

নারগীস সুলতানা : বাংলাদেশে এ ধরনের কাজ নতুন। এন্ডোফিটিক ফাংগির মলিকিউলার লেভেলে চিহ্নিত করার সুযোগ-সুবিধা না থাকায় মালয়েশিয়াতে এর নমুনা পাঠিয়ে জিন সিকুয়েন্সিসিং-এর কাজ করতে হয়েছে। উচ্চ রেজুলেশনের এনএমআর বিশ্লেষণের জন্য কিছু কম্পাউন্ড ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে তার সঠিক বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়েছে। Mass Spectroscopical Analysis-এর জন্য Ample বিদেশে পাঠাতে হয়েছে। ক্যানসার সেল লাইনের জন্য এর ওপর কাজ করে ঘবি New Compounds Biological Activity or Anti Cancer Property Evaluation-এর জন্য লন্ডনের কিংস কলেজের সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে। চলনবিলের মধ্যে ১০ ফুট পানির নীচ থেকে গাছ সংগ্রহ করেছি। Large Sample সংগ্রহ করতে হয়েছে, কারণ Aquatic Plant শুকালে খুব অল্প হয়ে যায়। একজন গবেষকের কাজের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা থাকেই, তা উতরেই সফলতা পাওয়া যায়।

ওয়ার্ল্ড ক্রাইম : এই গবেষণার সময়ে কোন ফলাফলগুলো আপনাকে বেশি আনন্দ দিয়েছে?

নারগীস সুলতানা : প্রাকৃতিক উপাদান নিয়ে গবেষণায় অনিশ্চয়তা থাকে। আগে থেকে কোনো কিছু অনুমান করা কঠিন হয়। পূর্বাভাস মেলে না। তাই প্রথম এক বছর খুবই হতাশাব্যঞ্জক ছিল। এ কারণে পরবর্তীতে ৩টি বিষয়ের ওপর জোর দেই। ১. এন্ডোফিটিক ফাংগি থেকে ৮টি Compound পৃথক ও চিহ্নিত করি। এর মধ্যে ৩টি নতুন Compound হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায়, যা আমাকে বেশি আনন্দ দিয়েছে। ২. ড. কুদরাত-এ-খুদা ডক্টরাল ফেলোশিপ পাওয়ার পর এবং সবশেষ জেএনপি’তে প্রবন্ধ প্রকাশিত হওয়ায় আমি নিজেকে ভাগ্যবান ও সম্মানিত মনে করছি। এর মাধ্যমে উৎসাহ পেয়ে সামনে এগিয়েছি।

ওয়ার্ল্ড ক্রাইম : পিএইচডি’র বিষয় নিয়ে ভবিষ্যতে কাজ করার আর কোনো পরিকল্পনা আছে আপনার?

নারগীস সুলতানা : অবশ্যই। কাজ তো সবে শুরু। আমার এই কাজ নিয়ে অনেক আশাবাদী আমি। গবেষণালব্ধ ফল থেকে অর্জিত শিক্ষাকে পুঁজি করে ভবিষ্যতে আমার ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে নিয়ে এক্ষেত্রে আমি আরও সুদূরপ্রসারি কাজে আত্মনিয়োগ করতে চাই।

ওয়ার্ল্ড ক্রাইম : ঔষধবিজ্ঞান বা স্বাস্থ্য খাতে আপনার এই গবেষণা কি ভূমিকা রাখবে?

নারগীস সুলতানা : গবেষণায় ৩টি অ্যাকুয়াটিক প্লান্ট নিয়ে কাজ করেছি। এতে কয়েকটি সম্পূর্ণ নতুন কম্পাউন্ড পেয়েছি। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘জার্নাল অব ন্যাচারাল প্রোডাক্ট (JNP)’তে আমার গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। আবিষ্কৃত নতুন কম্পাউন্ডগুলো হলো 9Desmethy1herbarin, 7-Desmethy1scorpione,7-Desmethy 16methy 1bostrycoidine, 2-6 Dihydroxyundieca7, 9Dienoic acid ৩টি Compound মানব টিউমার Cell Line-এর (সার্ভিকেল ক্যানসার, স্তন ক্যানসার, অগ্নাশয় ক্যানসার ও ফুসফুসের ক্যানসার) ওপর বিশেষভাবে কার্যকরী। অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল হিসেবেও এই নতুন কম্পাউন্ডগুলোর ভালো রিপোর্ট পাওয়া গেছে। যেহেতু আমার এই গবেষণালব্ধ কম্পাউন্ডগুলো সবই Bioactive, যার মধ্যে ৪টি নতুন কম্পাউন্ড আছে। ৩টি কম্পাউন্ডের Anti-tumor Activity রয়েছে In Comparison to the Clinically Active Marketed Product Doxorubicin। এই নতুন কম্পাউন্ডগুলোর ওপর ভবিষ্যতে আরও গবেষণা করে Highly Potential, Less Side Effect সম্বলিত নতুন Derivative তৈরি করে Effective Antibiotic বা Anti Cancer Product উৎপন্ন করার দ্বার উন্মোচিত হবে বলে আমার বিশ্বাস।

ওয়ার্ল্ড ক্রাইম : আপনার এই গবেষণা কাজের বা পিএইচডি অর্জনের উল্লেখ্যযোগ্য ধাপগুলো কি ছিল?

নারগীস সুলতানা : যে কোনো কাজ করতে হলে আন্তরিক হতে হয়, সেই কাজের সাথে মিশে যেতে হয়। গবেষণা কাজ করতে গিয়ে বর্ষাকালে ভরা মৌসুমে নাটোর জেলার চলনবিলের ৮-১০ ফুট পানির তলদেশ থেকে প্রায় ১০ কেজি পরিমাণ Aquatic Plant সংগ্রহ করতে হয়েছে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়াম থেকে Plant-গুলোর যথাযথ শনাক্তকরণ করা হয়েছে। Fresh Plant থেকে Endophytic Fungi পৃথক, শোধন ও চিহ্নিত করা একটা জটিল কাজ। যা বিসিএসআইআর থেকে ড. কুদরাত-এ-খুদা ডক্টোরাল ফেলোশিপ পাওয়ার সুবাদে, কাজটি যথাযথভাবে সম্পাদন করার অনেক সুযোগ পেয়েছি। Endophytic Fungi-গুলোর Species বা Molecular Level-এ চিহ্নিত করার সুযোগ বাংলাদেশ না থাকায় মালয়েশিয়া থেকে তা করা হয়েছে। UV, IR ও NMR Analysis of Compound for Identification করা হয়েছে বিসিএসআইআর ও জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটির ল্যাবরেটরি ব্যবহার করে। High Resolution NMR Analysis এবং Mass Analysis-এর জন্য কম্পাউন্ডগুলোকে ইংল্যান্ড পাঠিয়ে চিহ্নিতকরণ নিশ্চিত করা হয়েছে। Bioactivity Study যেমন অAnti Cancer Activity দেখার জন্য নতুন কম্পাউন্ডগুলোকে লন্ডনের কিংস কলেজে পাঠানো হয়েছিল। সবশেষ সফলতা হলো এ সংক্রান্ত ৩টি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জার্নাল, ‘জার্নাল অব ন্যাচারাল প্রোডাক্টস’, ‘এশিয়ান প্যাসিফিক জার্নাল অব বায়োমেডিসিন’ ও ‘বাংলাদেশ জার্নাল অব বোটানি’তে।

ওয়ার্ল্ড ক্রাইম : একজন নারী হিসেবে গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ও সংসার এই সময়ে কীভাবে সমন্বয় করতে পেরেছেন?

নারগীস সুলতানা : আমার মা ও স্বামী দুজনই খুব উদারচিত্তের, তাদের আগ্রহ, উৎসাহ, সহযোগিতা আমার গবেষণা কাজ অনেকটা সহজ করে দিয়েছে। তবে গবেষণা উপদেষ্টা ও তত্ত্বাবধায়কদের সার্বিক সহযোগিতা না পেলে গবেষণা সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে যেত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের প্রফেসর ড. মো. সোহেল রানা ও বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর)-এর প্রিন্সিপাল সাইন্টিফিক অফিসার ড. মো. হোসেন সোহরাবের তত্ত্বাবধানে ড. মো. কুদরাত-এ-খুদা ডক্টরাল ফেলোশিপ নিয়ে গবেষণার কাজটি সম্পূর্ণ করতে পেরেছি। গবেষণাকালে উপদেষ্টাম-লীর সদস্যদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের প্রফেসর ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান ও লন্ডনের কিংস কলেজের সিনিয়র প্রভাষক ড. মো. খন্দকার মিরাজ রহমান। তাদের সহযোগিতা, পরামর্শ ও দিক-নির্দেশনার কারণেই আমার আকাক্সক্ষাকে বাস্তবে রূপদানের শক্তি পেয়েছি। সেই মনোবল নিয়েই চাই ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে অবদান রাখতে। গবেষণায় যে ফলাফল পেয়েছি তা ভবিষ্যতে অ্যান্টি ক্যানসার ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ঔষধ উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে চাই।

ওয়ার্ল্ড ক্রাইম : ধন্যবাদ আপনাকে।

নারগীস সুলতানা : ধন্যবাদ।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY