বিএনপির রাজনীতির ৯ বছর

SHARE

khaleda-zia_114993ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ বিডি ডট কম,নিজস্ব প্রতিনিধি,১৩ ডিসেম্বর :  ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের ভরাডুবি এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় দীর্ঘ ৯ বছরে আবর্তিত তাদের রাজনৈতিক কর্মকা- নিয়ে জনমনে শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। মহাজোট সরকারের আমলে বিরোধী দল হিসেবে জনগণের কোন দাবি নিয়ে তারা রাজনৈতিক মঞ্চে আবির্ভূত হতে পারেনি। বরং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় নিজেদের অবস্থান ছিল অস্পষ্ট। দেশের অগ্রগতি ও উন্নয়নে কোন ধরনের অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়নি বিএনপির কোন নেতাকে। আন্তর্জাতিকভাবে নিজেদের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতেও ব্যর্থ হয় তারা। বরং ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ না করে বেগম খালেদা জিয়া বিতর্কিত হন। আর দুর্নীতির মামলায় নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে এ পর্যন্ত সক্ষম হননি তিনি। অন্যদিকে বিএনপির কিছু নিবেদিত সমর্থক শ্রেণী থাকলেও ৯ বছরে তাদের অবস্থানও পাল্টে গেছে। কেউ কেউ রাজনীতি থেকে দূরে আছেন। কেউ বা আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন। হরতাল-অবরোধ দিয়ে ঘরে বসে থেকে বিএনপি নেতারা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা সাধারণ মানুষকে আরও বেশি ভোগান্তিতে ফেলে। কারণ পেট্রোলবোমা আর আগুনে মানুষ পুড়িয়ে মারার ভয়ঙ্কর সংস্কৃতি চালু করেন তারা। ফলে গত ৯ বছরে বিএনপির রাজনীতি বিভিন্ন অভিযোগের কারণেই জনসমর্থন পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। অবশ্য এই সময়ের মধ্যে তারা একাধিক জনসমাবেশ করে দলের কর্মকা- সচল রাখার চেষ্টা করেছে।

॥ দুই ॥

গত ৯ বছরে দেশের ভেতর জঙ্গীবাদে মদদদাতা এবং বিদেশী নাগরিক হত্যাকা-ে বিএনপির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। ২৮ অক্টোবর (২০১৫) দেশের প্রায় সব জাতীয় দৈনিকের প্রধান সংবাদ হচ্ছে, গুলশানে ইতালীয় নাগরিক সিজার তাভেল্লা হত্যাকা-ের ঘটনায় বিএনপি নেতা এমএ কাইয়ূমের সম্পৃক্ততা। এক মাস আগের ওই ঘটনায় চার আসামিকে গ্রেফতার এবং তাদের একজনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীর পর পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, একজন ‘বড় ভাই’-এর পরিকল্পনা ও নির্দেশেই তাভেল্লাকে হত্যা করা হয়েছে। বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে বিনষ্ট করা এবং দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টার অংশ হিসেবে এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে জানা গেছে। সে সময় সরকারের মন্ত্রিপরিষদের কেউ কেউ বলেছিলেন, ঢাকা ও রংপুরে দুই বিদেশী নাগরিক হত্যা আর পুরান ঢাকার হোসেনী দালানে গ্রেনেড হামলা একই সূত্রে গাঁথা। অন্যদিকে ২৮ অক্টোবর একটি দৈনিকের সংবাদ হলো, বিমানবন্দর থেকে দেশী-বিদেশী যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার পরিকল্পনা করেছিল জামায়াত-বিএনপি। পত্রিকাটির মতে, হত্যা, সন্ত্রাস, জ্বালাও পোড়াও, অবরোধ-হরতালসহ নাশকতার বিভিন্ন ঘটনা ঘটিয়ে ব্যর্থ হয়ে জঙ্গী গ্রুপগুলোর সদস্যদের মাধ্যমে দেশে নাশকতার পরিকল্পনা করছে এ দুটি রাজনৈতিক দল। অর্থাৎ বিএনপি-জামায়াতের রাজনৈতিক কর্মকা-ে নাশকতা অনিবার্য। সম্প্রতি পাইলট সাব্বিরকে গ্রেফতার করা হলে বিমান নিয়ে হামলার পরিকল্পনাও স্পষ্ট হয়।

আসলে এ দেশে বিএনপির হঠকারী রাজনীতির ভয়াবহ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। ২০১৫ সালের শুরু থেকে বিএনপি ঘোষিত তিন মাস অবরোধ-হরতালে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। সহিংসতার ধারাবাহিকতায় দেশকে সঙ্কটের আবর্তে ফেলে দিয়ে বিএনপি-জামায়াতের নেতারা ঘরে বসে মজা দেখেছেন। ট্রেন লাইন উপড়ে ফেলা হয়েছে, পেট্রোলবোমার নাশকতার ছকে বলি হয়েছে গাড়ি চালক থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীরা পর্যন্ত। মানুষকে জিম্মি করে কি ফায়দা লুটতে চেয়েছিল ওই রাজনৈতিক দলসমূহ? তারা কি জনগণের কল্যাণ কামনা করে? প্রতি সপ্তাহে যে হারে সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে তাতে বিএনপি-জামায়াতের সমর্থক বেড়েছে বলে মনে হয় না। যদিও তারা প্রচার করছে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জয় তাদের নিশ্চিত। দলীয় হঠকারিতা, নাশকতা ও জঙ্গীপনাকে প্রত্যাখ্যান করছি আমরা। সাংগঠনিকভাবে বিএনপির তুলনায় আওয়ামী লীগ জনগণের পক্ষে কাজ করছে কিনা- এসব বিতর্কে লিপ্ত না হয়েও বলা যায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় এবং ফাঁসি কার্যকর করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। সেই সংগ্রামে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সদস্যদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকলেও অনেক দিক থেকে তৃণমূল মানুষের সেবায় নিয়োজিত এ দলের নেতাকর্মীরা। পক্ষান্তরে সব জায়গায় ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরে আছে হত্যা মামলার আসামি, প্রবাসী, ড্রাইভার, কাজের ছেলে, ভাঙ্গারি, দোকানদার, বয়স্ক, বিবাহিত, সন্তানের জনক, চিহ্নিত বেঈমান, চাকরিচ্যুত, ব্যবসায়ী এমনকি সাবেক জঙ্গীগোষ্ঠীর নেতারা। যোগ্য, ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে অর্থের বিনিময়ে ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরে কেন্দ্রীয় কমিটিতে অনেক পদ দেয়া হয়েছে। স্বজনপ্রীতি ও অর্থবাণিজ্য তাদের রাজনীতির চালিকাশক্তি। ছাত্রদলের কমিটিতে আছে বুয়েট ছাত্র সনি হত্যার আসামি (৫ বছর জেলও খেটেছেন) নিয়াজ মাখদুম মাসুম বিল্লাহ। ঢাবি জহুরুল হক হল ছাত্রদলের নেতা খোকন হত্যার আসামি শোয়েব, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজল দেবনাথ হত্যা মামলার আসামি ইমরান হোসেন। এমনকি গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করার পর ঢাবি জিয়াউর রহমান হলে খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়ার ছবি ভাংচুর করেছিল এমন সব ব্যক্তি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে ঢুকে পড়েছে। তারেক রহমান গ্রেফতার হওয়ার পর যার নেতৃত্বে মধুর কেন্টিনে মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছিল তাকেও দেয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদ। অর্থাৎ বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে যুগান্তকারী, সাহসী ও দূরদর্শীমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো নেতা নেই। রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে বিএনপি-জামায়াতের গুণগত মান ও উৎকর্ষ একেবারেই শূন্য।

॥ তিন ॥

বিএনপি ও জামায়াত অনেক আগে থেকেই চিন্তা-চেতনায় একই ধরনের। তাদের রাজনৈতিক কোন আদর্শ নেই। মাথায় আছে মানুষ মারার ষড়যন্ত্র। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংসদের বাইরের বিরোধী দল হিসেবে তারা কোন কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি। বরং মহাজোট সরকারের আমলে সংসদ বর্জন করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগকে উদ্দেশ্য করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের কিছু দিন আগে বলেছিলেন, ২০০৭ সালে আপনারা কেএম হাসানকে মেনে নেননি, তাই এখন দলীয়প্রধান শেখ হাসিনাকে আমরা মেনে নেব না। শেখ হাসিনার অধীনে কোনভাবেই নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে না। তাই তাকে পদত্যাগ করতেই হবে। তিনি আরও বলেছেন, নৌকার তলা এখন ফুটো হয়ে গেছে, তাই নৌকা ডুবে যাচ্ছে। এই ডুবন্ত নৌকায় এখন আর কেউ উঠবে না। সবাই ইঁদুরের মতো নৌকা থেকে লাফিয়ে বাঁচার চেষ্টা করবে। সারাদেশের মানুষের এখন একটাই দাবি আর তা হচ্ছে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন। তাই সব রাজনৈতিক দলকে বলব, আসুন ঐক্যবদ্ধ হই। কে ছোট কে বড়, সেটা দেখার সময় এখন নেই। কে ডানে কে বামে তা দেখারও সময় নেই। আসুন আওয়ামী লীগকে বিদায় করে একসঙ্গে নির্বাচন করে সরকার গঠন করি। এখন একমাত্র কাজ এ সরকারকে হটিয়ে দেশ রক্ষা করা। বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় গেলে আলোকিত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হবে। কাজেই দেশবাসীকে বলব ‘হঠাও আওয়ামী লীগ, বাঁচাও দেশ।’ বেগম জিয়া বিভিন্ন জনসভায় মানুষকে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে নিজের দলের ফায়দা লুটতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে সময় যেমন সর্ব ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছিলেন তেমনি বর্তমান সরকারের ধারাবাহিকতায় (৯ বছরে) নিরন্তর চেষ্টা করে সফল না হওয়ার সম্ভাবনা দেখে নাশকতার পথ বেছে নিয়েছিলেন কি?

বিএনপি নামক দলটির ভেতরে কোন্দল আর জামায়াত তথা মৌলবাদী দলগুলোর সঙ্গে দরকষাকষি আর কলহ আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভীষিকার জন্ম দিয়েছে। খালেদা জিয়ার বাড়ি ছাড়ার ইস্যু থেকে পরবর্তী প্রতিটি ইস্যুর হরতালই ব্যর্থ হিসেবে গণ্য হয়েছে। ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা দল ছেড়েছেন; অন্যান্য প্রভাবশালী নেতার মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব। বিভিন্ন জেলায় খালেদা জিয়ার সমাবেশের মধ্যেই আমরা লক্ষ্য করেছি বিএনপির দলীয় কোন্দল। গত ১৮.০৯.২০১৩ তারিখে একটি দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে, ‘দক্ষিণে বিএনপির মূলধারা ও সংস্কারপন্থী বিরোধ চরমে।’ ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, ভোলার বিএনপির মতো আন্তঃকলহ রয়েছে অনেক জায়গায়। রাজপথে সরকার পতনের মতো আন্দোলনের সাংগঠনিক ক্ষমতা না থাকায় এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা ভাল হওয়ায় বিএনপি জনগণের কোন আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। ইতোপূর্বে একাধিকবার সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, ‘বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট সরকার সামাজিক দুর্বৃত্তায়নকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ায় অতীতে দেশ সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ ও লাগামহীন দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিল। সে সময় রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় উন্মত্ত জোটের মন্ত্রী ও দলীয় নেতাদের তা-বের কথা আমাদের সকলের মনে আছে।’ এ জন্য রাজশাহীতে খালেদা জিয়া যে বলেছিলেন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় গেলে আলোকিত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হবে।’ এক কথায় জনগণের কেউই বিশ্বাস করবে না। মিথ্যাবাদী জামায়াত-বিএনপি জোটের ২০০১ সালের তা-বের আলামত মহাজোট সরকারের আমলেও দেখা গেছে। জামায়াত-শিবির কাদের মোল্লার ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে নাশকতার মধ্য দিয়ে হরতাল পালন করেছিল। আগের মতোই পুলিশের ওপর নির্বিচারে হামলা চালিয়েছে, হত্যা করেছে নিরীহ মানুষকে। তাদের নেতাদের মামলার রায়কে কেন্দ্র করে এর আগে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানের হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা এবং অগ্নিসংযোগ এবং অন্যান্য সন্ত্রাসী ঘটনা আমরা লক্ষ্য করেছি। বিভিন্ন হিন্দু বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও তা-বের ঘটনায় ছিল জামায়াতের প্রত্যক্ষ ইন্ধন এবং সংযোগ। ধর্মীয় মৌলবাদীরা সুযোগের সন্ধানে রয়েছে। তারই স্পষ্ট আলামত দেখা গেছে অনেক স্থানের ঘটনায়। অন্যদিকে নিষিদ্ধ ঘোষিত ধর্মভিত্তিক গোপন সংগঠনের কার্যক্রম যে থেমে নেই তারও দৃষ্টান্ত পাওয়া যাচ্ছে জঙ্গী সমর্থকদের ধ্বংসাত্মক কর্মকা- দেখে। প্রতি সপ্তাহে আতঙ্ক সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে। বিএনপি-জামায়াতের সহিংসতা থেকে মুক্তির উপায় তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে বর্জন করা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগের পতাকাতলে সমবেত হওয়া।

লেখক : অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
writermiltonbiswas@gmail.com
(সংগৃহীত)

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY